জহিরুল ইসলাম রাতুল।। খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার সকালে তিনি আকস্মিকভাবে হাসপাতালটিতে গিয়ে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখেন, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।বুধবার ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় জরুরি অপারেশন থিয়েটার (ইমার্জেন্সি ওটি) ও সংলগ্ন স্টোররুম এলাকায় হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে ধোঁয়া বের হতে দেখে হাসপাতালের কর্মচারীরা বিষয়টি টের পান। পরে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পুরো ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন লাগার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে আইসিইউ, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে থাকা রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। অনেক রোগীকে অক্সিজেন সাপোর্টসহ দ্রুত নিচে নামিয়ে অন্য ভবনে স্থানান্তর করতে হয়। রোগীদের স্বজনরা কান্নাকাটি ও চিৎকার করতে থাকেন। এক পর্যায়ে হাসপাতালজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুনে হাসপাতালের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম, আসবাবপত্র ও স্টোরে থাকা মালামাল পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অগ্নিকাণ্ডের সময় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় নাসরিন নাহার (২২) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রোগীকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সময় শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তার অবস্থার অবনতি ঘটে। এছাড়া কয়েকজন নার্স ও হাসপাতালকর্মী ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এ ঘটনায় রোগীর স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন।পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ওটি, স্টোররুম, জরুরি বিভাগ ও বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। তিনি চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের কাছ থেকে নানা অভিযোগ শোনেন।
হাসপাতালে রেবিস ভ্যাকসিন সংকট, বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করা এবং রোগীদের দুর্ভোগের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “সরকার চিকিৎসাসেবার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিচ্ছে। তারপরও কেন রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হবে—এ বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে।”মন্ত্রী আরও বলেন, হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সঙ্গে কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করা হবে না। জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।
হাসপাতালের রান্নাঘর ও রোগীদের জন্য প্রস্তুত খাবারের মানও পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় নিম্নমানের খাবার দেখে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।তিনি সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা যেন অন্তত মানসম্মত খাবার পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যের মান নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।”
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট কিংবা পুরোনো এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালের পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন ও অতিরিক্ত চাপও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “হাসপাতাল হচ্ছে মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ধরনের গাফিলতি চলবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। হাসপাতালের অনেক ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
Copyright © 2022 KhulnarKhabor.com মেইল:khulnarkhobor24@gmail.com।জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা আইনে তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধন আবেদিত।স্মারক নম্বর:- ০৫.৪৪.৪৭০০.০২২.১৮.২৪২.২২-১২১।এই নিউজ পোর্টালের কোন লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।